দোয়া ও যিকির

অসুস্থতার সময়ের দোয়া | কুরআন ও হাদীস অনুযায়ী রোগমুক্তির দোয়া

অসুস্থতার সময়ের দোয়া

ভূমিকা

 

মানুষের জীবনে সুস্থতা একটি মহান নিয়ামত। অসুস্থ হলে আমরা বুঝতে পারি, “সুস্থ দেহ” আসলে কত বড় নেয়ামত। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন—

 

> **وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ**

> *“আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই (আল্লাহ) আমাকে আরোগ্য দান করেন।”*

 (সূরা আশ-শু’আরা ২৬:৮০)

 

এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আসল শিফা বা আরোগ্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই অসুস্থতার সময় আমাদের করণীয় হচ্ছে ধৈর্য ধরা, নামাজে মনোযোগী থাকা, এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখিয়ে দেওয়া দোয়াগুলো পাঠ করা।

অসুস্থতার সময় ধৈর্য ধরার ফজিলত

 

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

 

> **“যে মুসলমান কোনো কষ্ট, রোগ, উদ্বেগ, দুঃখ, কষ্ট, কিংবা দুশ্চিন্তায় পতিত হয়, এমনকি যদি কোনো কাঁটা তাকে বিঁধে, তবুও আল্লাহ তা দ্বারা তার কিছু গুনাহ মাফ করে দেন।”**

> — (সহিহ বুখারী, হাদীস: ৫৬৪১)

 

অতএব, অসুস্থতা শুধু কষ্ট নয়, এটি গুনাহ মোচনের একটি সুযোগও বটে।

 

 🕋 অসুস্থতার সময়ের দোয়া (কুরআন থেকে)

 

১️⃣ **নবী আইয়ুব (আ.)-এর দোয়া**

 

> **رَبِّ إِنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ**

> উচ্চারণ: *“রাব্বি ইন্‌নি মাস্‌সানিয়াদ দুর্‌রু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমিন।”*

> অর্থ: “হে আমার পালনকর্তা! আমি কষ্টে আক্রান্ত হয়েছি, আর তুমি দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।”

> — (সূরা আল-আনবিয়া ২১:৮৩)

 

📖 **ব্যাখ্যা:**

এই দোয়াটি এমন সময় পড়া উচিত যখন আপনি শারীরিক বা মানসিক কষ্টে ভুগছেন। নবী আইয়ুব (আ.) দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকেও ধৈর্য ধরেছিলেন, আল্লাহ শেষে তাঁকে সুস্থ করে দিয়েছিলেন।

সুস্থতা ও নিরাপত্তার দোয়া

 

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ

 উচ্চারণ: *“আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযু বিকা মিনাল বারাসি, ওয়াল জুনুনি, ওয়াল জুযামি, ওয়া মিন সাইয়্যিল আসকাম।”*

 অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই কুষ্ঠরোগ, উন্মাদনা, কুষ্ঠ এবং সকল খারাপ রোগ থেকে।”

 (আবু দাউদ, হাদীস: ১৫৫৪)

 

**ব্যাখ্যা:**

এই দোয়াটি প্রতিদিন সকালে বা রাতে পড়া ভালো, বিশেষ করে যখন আপনি বা আপনার পরিবার অসুস্থ থাকে বা রোগের আশঙ্কা থাকে।

 

 

**কুরআনের শিফা বিষয়ক আয়াত**

**وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ**

উচ্চারণ: *“ওয়া নুনায্যিলু মিনাল কুরআনি মা হুয়া শিফাউঁ ওয়া রাহমাতুল্লিল মুমিনিন।”*

অর্থ: “আমি কুরআনে এমন কিছু নাজিল করেছি যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত।”

(সূরা ইসরাঃ ১৭:৮২)

 

**ব্যাখ্যা:**

রোগমুক্তির জন্য কুরআনের আয়াত পাঠ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ। এটি শরীর ও আত্মা দুইয়ের জন্যই শিফা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ শিখানো অসুস্থতার দোয়াসমূহ

 

 **সাধারণ অসুস্থতার দোয়া**

 

> **اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا**

উচ্চারণ: *“আল্লাহুম্মা রাব্বান্ নাস, আজহিবিল বাস, ইশফি, আন্তাশ শাফি, লা শিফা’ইল্লা শিফাউক, শিফা’আঁ লা ইউগাদিরু সাকামা।”*

অর্থ: “হে মানবজাতির রব! কষ্ট দূর করে দাও, আরোগ্য দান করো। তুমি একমাত্র আরোগ্যদাতা। তোমার আরোগ্য ছাড়া আর কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দাও যাতে কোনো রোগ অবশিষ্ট না থাকে।”

(সহিহ বুখারী, হাদীস: ৫৭৪৩)

**ব্যাখ্যা:**

এই দোয়াটি অসুস্থ ব্যক্তির ওপর পড়া যায় বা নিজেও নিজের জন্য পাঠ করা যায়।

 **অসুস্থের জন্য হাত রেখে পড়ার দোয়া**

 

> **بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ اشْفِ عَبْدَكَ وَصَدِّقَ رَسُولَكَ**

উচ্চারণ: *“বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা ইশফি ‘আবদাকা ওয়া সাদ্দিক রাসূলাকা।”*

অর্থ: “আল্লাহর নামে শুরু করছি, হে আল্লাহ! তোমার বান্দাকে আরোগ্য দান করো এবং তোমার রাসূলকে সত্য প্রমাণ করো।”

(তিরমিজি, হাদীস: ২০৮০)

 

**ব্যাখ্যা:**

রাসূলুল্লাহ ﷺ অসুস্থের মাথায় বা শরীরে ডান হাত রেখে এই দোয়াটি পড়তেন। আপনি চাইলে পরিবারের অসুস্থ সদস্যের জন্যও এভাবে দোয়া করতে পারেন।

**অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সাতবার দোয়া করা**

 

> **أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ، رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ** উচ্চারণ: *“আসআলুল্লাহাল আযিমা রাব্বাল ‘আরশিল আযিমি আন্ ইয়াশফিয়াকা।”*

অর্থ: “আমি মহান আল্লাহ, মহান আরশের রবের নিকট প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আপনাকে আরোগ্য দান করেন।”

 (আবু দাউদ, হাদীস: ৩১০৬)

 

 **ব্যাখ্যা:**

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন — “যে কেউ কোনো অসুস্থের কাছে গিয়ে এই দোয়াটি সাতবার পাঠ করে, আল্লাহ চাইলে তাকে সুস্থতা দান করেন।”

**অসুস্থতার সময় নিজের জন্য পড়ার দোয়া**

 

**اللَّهُمَّ رَحْمَتَكَ أَرْجُو، فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ، وَأَصْلِحْ لِي شَأْنِي كُلَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ**

উচ্চারণ: *“আল্লাহুম্মা রাহমাতাকা আরজু, ফালা তাকিলনি ইলা নাফসি তারফাতা আয়নিন, ওয়া আসলিহ লি শা’নি কুল্লাহু, লা ইলাহা ইল্লা আন্ত।”*

অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি তোমার রহমতের আশা রাখি, এক পলকের জন্যও আমাকে আমার নিজের উপর ছেড়ে দিও না, আমার সব ব্যাপার ঠিক করে দাও। তোমা ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।”

(আবু দাউদ, হাদীস: ৫০৯০)

🌼 অসুস্থতার সময়ের কিছু আমল

 

1. **অযু অবস্থায় থাকা:**

   রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি অযু অবস্থায় ঘুমায়, রাতে যখনই জাগে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করে, আল্লাহ তার দোয়া কবুল করেন।” (সহিহ বুখারী)

 

2. **সুরা ফাতিহা পড়া:**

   এটি “শিফার সুরা”। অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সুরা ফাতিহা পাঠ করা যেতে পারে।

 

3. **রুকইয়াহ (রোগ নিরাময়ের আয়াত পাঠ):**

   রাসূলুল্লাহ ﷺ সুরা ফালাক, নাস, ও ইখলাস তিনবার করে পড়তেন এবং শরীরে ফুঁ দিতেন।

🌺 অসুস্থতার সময় করণীয় দোয়া ও আমলের তালিকা

 

| দোয়া / আমল                          | উদ্দেশ্য                     |

| ———————————– | —————————- |

| রাব্বি ইন্‌নি মَسَّنِيَ الضُّرُّ… | কষ্টে আরোগ্যের আবেদন         |

| আল্লাহুম্মা রাব্বান্ নাস…         | শরীরিক সুস্থতা চাওয়া         |

| আসআলুল্লাহাল আযিমা…               | অন্যের জন্য আরোগ্য প্রার্থনা |

| সুরা ফাতিহা, ফালাক, নাস             | রুকইয়াহ বা চিকিৎসামূলক পাঠ   |

| আল্লাহুম্মা রাহমাতাকা আরজু…       | নিজের জন্য দোয়া              |

| রোগীর খোঁজ নেওয়া                    | সুন্নত ও সওয়াবের কাজ         |

 

💫 অসুস্থতার সময় রোগী দেখতে যাওয়ার ফজিলত

 

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

 

> “যে ব্যক্তি সকালে কোনো অসুস্থ ব্যক্তির খোঁজ নিতে যায়, তার জন্য ৭০,০০০ ফেরেশতা সন্ধ্যা পর্যন্ত দোয়া করে। আর সন্ধ্যায় গেলে, সকাল পর্যন্ত দোয়া করে।”

> — (তিরমিজি, হাদীস: ৯৬৯)

 

অতএব, অসুস্থ ভাই-বোন বা আত্মীয়কে দেখতে যাওয়া শুধু মানবিক কাজ নয়, বরং এটি মহান সওয়াবের কাজ।

🌻 অসুস্থতার সময় মনে রাখার কিছু বিষয়

 

1. রোগ আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা। ধৈর্য ধরলে এটি জান্নাতের পথ খুলে দেয়।

2. চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নত, কারণ রাসূল ﷺ বলেছেন, “প্রতিটি রোগের জন্য আল্লাহ কোনো না কোনো চিকিৎসা রেখেছেন।”

3. হতাশ হওয়া নয়, বরং আল্লাহর রহমতের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।

4. রোগে আক্রান্ত হলে অন্যের প্রতি রাগ বা অভিযোগ না করে আল্লাহর উপর নির্ভর করতে হবে।

🌙 সমাপ্তি দোয়া

 

> **اللَّهُمَّ اشْفِنِي شِفَاءً تَامًّا، وَارْزُقْنِي صِحَّةً دَائِمَةً، وَاجْعَلْنِي مِنَ الشَّاكِرِينَ عَلَى نِعْمَتِكَ**

> উচ্চারণ: *“আল্লাহুম্মা ইশফিনি শিফাআন তাম্মান, ওয়ারযুকনি সিহ্যাতান দায়িমাতান, ওয়াজআলনি মিনাশ শা’কিরিন ‘আলা নি’মাতিকা।”*

> অর্থ: “হে আল্লাহ! আমাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করো, স্থায়ী স্বাস্থ্য দাও, আর তোমার নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ বানাও।”

📜 উপসংহার

 

অসুস্থতা জীবনের বাস্তবতা, কিন্তু এটি আল্লাহর রহমতের দরজা। কষ্টে ধৈর্য ধরে দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসাই আমাদের প্রকৃত কর্তব্য। রাসূল ﷺ বলেছেন—

 

> “যে ব্যক্তি রোগে ধৈর্য ধরে, আল্লাহ তাকে সেই ধৈর্যের বিনিময়ে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদা দান করবেন।”

 

🕊️ **আসুন, অসুস্থতার সময় আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করি, দোয়া করি, ধৈর্য ধরি, এবং চিকিৎসা গ্রহণ করি।**

IslamicSeva

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

দোয়া ও জিকির
দোয়া ও যিকির

দোয়া ও জিকির: আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত জীবন

দোয়া ও জিকির মুমিনের অন্তরের প্রশান্তি, পাপ মোচন ও আল্লাহর রহমত পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। কুরআন ও হাদীসের আলোকে দোয়া ও
সকালবেলার দোয়া আরবি সহ বাংলা অনুবাদ
দোয়া ও যিকির

সকালবেলার দোয়া আরবি সহ বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা অনুবাদ

ভূমিকা মানুষের জীবনে প্রতিটি দিন নতুন করে শুরু হয় সকাল দিয়ে। আর এই সকালকে আল্লাহর স্মরণে শুরু করা একজন মুসলমানের