দোয়া ও যিকির

ঘুমানোর দোয়া (ঘুমানোর আগে পড়ার দোয়া) | Ghumanor Doa in Arabic, Bangla & Meaning

ঘুমানোর আগে পড়ার দোয়া

ঘুমানোর আগে পড়ার দোয়া ও ফজিলত জানুন। ঘুমের দোয়া পড়লে আল্লাহর হেফাজতে ঘুমানো হয়। ইসলাম অনুযায়ী ঘুমানোর আগে করণীয় ও দোয়া শিখুন।

 ঘুম — আল্লাহর এক অমূল্য নিয়ামত

ঘুম মানুষের শরীর ও মনের জন্য এক অপরিহার্য বিশ্রাম। প্রতিদিনের কাজ শেষে যখন আমরা ঘুমাতে যাই, তখন আল্লাহ তায়ালা আমাদের শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
কিন্তু ইসলাম শুধুমাত্র ঘুমকেও ইবাদতের অংশে পরিণত করেছে। যদি আমরা ঘুমানোর আগে আল্লাহর স্মরণ করি, দোয়া পড়ি, তাহলে আমাদের ঘুমও সওয়াবের কাজ হয়ে যায়।

আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেনঃ

“তিনিই তোমাদের জন্য রাত্রিকে করেছেন পোশাকস্বরূপ, আর ঘুমকে করেছেন বিশ্রামের উপায়।”
📖 (সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৪৭)

অর্থাৎ ঘুমও আল্লাহর রহমতের প্রকাশ। তাই ঘুমানোর আগে তাঁরই স্মরণ করা উচিত।

ঘুমানোর আগে দোয়া পড়ার গুরুত্ব

ইসলামে প্রতিটি কাজের আগে দোয়া পড়ার নির্দেশনা আছে — খাওয়া, ঘর থেকে বের হওয়া, টয়লেটে যাওয়া, এমনকি ঘুমানোর আগেও।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

“যে ব্যক্তি রাতে আল্লাহর স্মরণ ছাড়া ঘুমায়, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
📖 (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৬২০২)

অর্থাৎ ঘুমানোর আগে দোয়া না পড়লে মানুষ শয়তানের প্রভাবের শিকার হতে পারে।
আর ঘুমের আগে দোয়া পড়লে —
✅ আল্লাহ আমাদের হেফাজতে রাখেন
✅ শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়
✅ ঘুম হয় প্রশান্তিময় ও সওয়াবপূর্ণ

 ঘুমানোর দোয়া (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ)

দোয়া ১:

আরবি:
اللَّهُمَّ بِاسْمِكَ أَحْيَا وَبِاسْمِكَ أَمُوتُ

উচ্চারণ:
আল্লাহুম্মা বিস্মিকা আহইয়া ওয়া বিস্মিকা আমুতু।

অর্থ:
হে আল্লাহ! তোমারই নামে আমি জীবিত হই এবং তোমারই নামে আমি মরি (ঘুমাই)।
📖 (সহিহ বুখারি – ৬৩১২, সহিহ মুসলিম – ২৭১০)

এই দোয়াটি পড়লে মানুষ আল্লাহর নামে ঘুমায়, তাঁর হেফাজতে রাত কাটায়, এবং যদি মৃত্যুও আসে, তবে সেটাও আল্লাহর নামে হয়।

 

দোয়া ২ (তিন কুল পড়া):

রাসুলুল্লাহ ﷺ ঘুমানোর আগে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, এবং সূরা নাস পড়ে নিজের শরীরে ফুঁ দিতেন।

পড়ার নিয়ম:

সূরা ইখলাস (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ)

সূরা ফালাক (قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ)

সূরা নাস (قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ)

এরপর দুহাত একত্র করে ফুঁ দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেখে নিতে হবে।
📖 (সহিহ বুখারি – ৫০১৭, সহিহ মুসলিম – ২১৯২)

এটি একটি শক্তিশালী আমল যা শয়তানের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়।

 

দোয়া ৩ (ঘুমানোর আগে তাসবিহ):

ফাতিমা (রাঃ) কে রাসুল ﷺ শিখিয়েছিলেন,

“ঘুমানোর আগে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার বলো।”

📖 (সহিহ বুখারি – ৬৩১৮)

এটি দেহের ক্লান্তি দূর করে এবং মনকে প্রশান্ত করে।

 

দোয়া ৪ (যদি ভয় লাগে ঘুমানোর সময়):

আরবি:
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّاتِ مِنْ غَضَبِهِ وَعِقَابِهِ، وَمِنْ شَرِّ عِبَادِهِ، وَمِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ وَأَنْ يَحْضُرُونِ

উচ্চারণ:
আউযু বিকালিমাতিল্লাহিত তাম্মাতি মিন গাদাবিহি ওয়া ইকাবিহি, ওয়া মিন শাররি ইবাদিহি, ওয়া মিন হামাযাতিশ শায়াত্বিনি ওয়া আয়্যাহদুরূন।

অর্থ:
আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর পূর্ণ বাণীর মাধ্যমে তাঁর রাগ ও শাস্তি থেকে, তাঁর বান্দাদের অশুভ থেকে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা ও উপস্থিতি থেকে।

 ঘুমানোর আগে করণীয় সুন্নতসমূহ

রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের ঘুমানোর আগে কিছু সুন্দর অভ্যাস শিখিয়েছেন, যা অনুসরণ করলে ঘুম হয় বরকতময়।

করণীয়

বর্ণনা

🧼 ওজু করে ঘুমানো

রাসুল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি ওজু করে ঘুমায়, সে ঘুমানোর সময়ও ইবাদতে থাকে।” (সহিহ বুখারি)

🤲 ঘুমের দোয়া পড়া

উপরের দোয়াগুলো পড়ে শোয়া

🕋 ডান কাতে শোয়া

রাসুল ﷺ ডান কাতে শোয়ার নির্দেশ দিয়েছেন

☁️ কিবলামুখী হয়ে শোয়া

এটি সুন্নত

❤️ ক্ষমা করে ঘুমানো

কারও প্রতি মনোমালিন্য থাকলে ক্ষমা করে ঘুমানো উচিত

📖 সূরা মুলক পড়া

ঘুমানোর আগে সূরা মুলক পড়লে কবরের আজাব থেকে মুক্তি মেলে (সহিহ তিরমিজি)

ঘুমের আগে দোয়া পড়ার ফজিলত

আল্লাহর হেফাজতে থাকা:
রাসুল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতে ওজু করে ঘুমায় এবং আল্লাহর স্মরণে থাকে, তার আত্মা আল্লাহর নিকট নিরাপদ থাকে।”

 

শয়তান থেকে মুক্তি:
ঘুমানোর আগে দোয়া পড়লে শয়তান কাছে আসতে পারে না।

 

প্রশান্ত ঘুম:
যারা ঘুমের আগে দোয়া ও যিকির করে, তাদের ঘুম হয় স্বস্তিদায়ক ও মানসিকভাবে শান্তিপূর্ণ।

 

ইবাদতের সওয়াব:
দোয়া ও যিকিরের মাধ্যমে ঘুমও ইবাদতে পরিণত হয়।

 

বিজ্ঞানসম্মতভাবে ঘুমের দোয়ার উপকারিতা

আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে — ঘুমানোর আগে ইতিবাচক চিন্তা, শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ, ও মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা ঘুমের মান উন্নত করে।
দোয়া পড়ার সময় আমরা মানসিকভাবে শান্ত হই, হৃদস্পন্দন কমে যায়, এবং মন প্রশান্ত হয়।
অর্থাৎ ইসলামিক ঘুমের দোয়া কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বৈজ্ঞানিকভাবেও স্বাস্থ্যকর।

 ঘুমের সময় নিষেধাজ্ঞা

ইসলাম কিছু ঘুমের ভঙ্গি ও অভ্যাসকে নিষেধ করেছে।

পেটের ওপর শোয়া (এটি শয়তানের ভঙ্গি বলে হাদিসে এসেছে)

ওজু ছাড়া ঘুমানো

কারও প্রতি রাগ রেখে ঘুমানো

ফজরের আগে ঘুম থেকে উঠেও সালাত না পড়া

এইসব অভ্যাস এড়িয়ে চললে ঘুম হয় প্রশান্ত ও বরকতময়।

 ছোট শিশুদের ঘুমানোর আগে দোয়া শেখানো

শিশুদের ঘুমানোর সময় “আল্লাহুম্মা বিস্মিকা আহইয়া ওয়া বিস্মিকা আমুতু” শেখানো খুবই উপকারী।
এটি তাদের মনে আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা উভয়ই জাগায়।
ধীরে ধীরে এই অভ্যাস তাদের চরিত্র গঠনে সহায়তা করে।

 

🌙 ঘুম থেকে জাগার পরের দোয়া

যখন ঘুম থেকে জাগবেন, তখন রাসুল ﷺ এই দোয়াটি পড়তেন:

আরবি:
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ

উচ্চারণ:
আলহামদুলিল্লাহিল্লাযি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা, ওয়া ইলাইহিন নুশূর।

অর্থ:
সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যু (ঘুম) থেকে জাগিয়ে তুলেছেন, আর তাঁরই দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন।
📖 (সহিহ বুখারি – ৬৩১৪)

উপসংহার

ঘুমানোর দোয়া শুধু কয়েকটি শব্দ নয় — এটি আল্লাহর প্রতি এক প্রকার আত্মসমর্পণ।
যে ব্যক্তি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এই দোয়াগুলো পড়ে, সে আল্লাহর হেফাজতে রাত কাটায় এবং তার ঘুম হয়ে যায় ইবাদতস্বরূপ।
তাই আসুন, আজ থেকেই আমরা সবাই চেষ্টা করি ঘুমানোর আগে ও ঘুম থেকে জাগার পর আল্লাহর স্মরণ করার।

IslamicSeva

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

দোয়া ও জিকির
দোয়া ও যিকির

দোয়া ও জিকির: আল্লাহর স্মরণে প্রশান্ত জীবন

দোয়া ও জিকির মুমিনের অন্তরের প্রশান্তি, পাপ মোচন ও আল্লাহর রহমত পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। কুরআন ও হাদীসের আলোকে দোয়া ও
সকালবেলার দোয়া আরবি সহ বাংলা অনুবাদ
দোয়া ও যিকির

সকালবেলার দোয়া আরবি সহ বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা অনুবাদ

ভূমিকা মানুষের জীবনে প্রতিটি দিন নতুন করে শুরু হয় সকাল দিয়ে। আর এই সকালকে আল্লাহর স্মরণে শুরু করা একজন মুসলমানের