ইসলামিক শিক্ষা কুরআন ও তাফসীর হাদিস

কিয়ামত ও বিচার দিবসের বর্ণনা – কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে পূর্ণ আলোচনা

ভূমিকা

এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়। আল্লাহ তাআলা মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। একদিন এই পৃথিবী ধ্বংস হবে, সমস্ত সৃষ্টি বিলীন হবে, এবং শুরু হবে এক নতুন জগত—আখিরাত। সেই দিনের নামই কিয়ামত।পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন:“প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। আর কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের আমলের পূর্ণ প্রতিদান দেওয়া হবে।”— (সূরা আলে ইমরান ৩:১৮৫) কিয়ামত ও বিচার দিবস হলো সেই দিন, যেদিন প্রতিটি মানুষ তার জীবনের হিসাব দেবে।

কিয়ামত কী?

“কিয়ামত” শব্দের অর্থ দাঁড়ানো বা প্রতিষ্ঠিত হওয়া। কিয়ামতের দিন মানুষ কবর থেকে উঠে দাঁড়াবে হিসাবের জন্য। পবিত্র কুরআনের একটি সূরার নামই হলো সূরা আল-ক্বারিয়াহ। সেখানে আল্লাহ বলেন:“মহাবিপর্যয়! কী সেই মহাবিপর্যয়? আর তুমি কী জানো, কী সেই মহাবিপর্যয়?”এই আয়াতে কিয়ামতের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে।

কিয়ামতের আলামত
১. ছোট আলামত-রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন ছোট আলামতের কথা বলেছেন। যেমন:মানুষের মধ্যে হত্যা বৃদ্ধি ,অশ্লীলতার প্রসার,সুদ ও দুর্নীতির আধিক্য,অযোগ্য লোকের হাতে দায়িত্ব,আজকের সমাজের দিকে তাকালে আমরা এসব আলামত স্পষ্ট দেখতে পাই।

 

২. বড় আলামত-সহিহ হাদিসে বর্ণিত বড় আলামতগুলোর মধ্যে রয়েছে:
দাজ্জালের আবির্ভাব,ঈসা (আ.)-এর আগমন,ইয়াজুজ-মাজুজের বের হওয়া,সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়া,দুনিয়াজুড়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়া
এই বড় আলামতগুলো প্রকাশের পর কিয়ামত অতি নিকটে চলে আসবে।

কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ দৃশ্য

কুরআনে কিয়ামতের দিনের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহভাবে বর্ণিত হয়েছে।সূরা যিলযাল-এ বলা হয়েছে:“যখন পৃথিবী তার প্রবল কম্পনে কেঁপে উঠবে এবং পৃথিবী তার বোঝা বের করে দেবে।”সেই দিনের অবস্থা:পাহাড় তুলোর মতো উড়ে যাবে।,আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে।
সমুদ্র জ্বলে উঠবে।,মানুষ মাতালের মতো ছুটবে, অথচ তারা মাতাল হবে না।সেই দিন মায়ের কাছে সন্তানও গুরুত্বহীন হয়ে যাবে। প্রত্যেকে শুধু নিজের চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে।

শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া

আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতা ইস্রাফিল (আ.) শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন।প্রথম ফুঁয়ে সবকিছু ধ্বংস হবে।
দ্বিতীয় ফুঁয়ে সবাই পুনরুত্থিত হবে।পবিত্র কুরআনের সূরা ইয়াসিন-এ বলা হয়েছে:“আর শিঙ্গায় ফুঁ দেওয়া হবে, তখনই তারা কবর থেকে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে যাবে।”

হাশরের ময়দান

সব মানুষ এক বিশাল প্রান্তরে একত্রিত হবে। এই স্থানকে বলা হয় “মাহশার”।সূর্য মানুষের খুব কাছে চলে আসবে।মানুষ ঘামে ডুবে যাবে।কারও ঘাম হবে গোঁড়ালি পর্যন্ত, কারও হাঁটু পর্যন্ত, কারও মুখ পর্যন্ত।সেদিন কেউ কারও উপকারে আসবে না, শুধুমাত্র আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন, সে শাফায়াত করতে পারবে।

আমলনামা প্রদান

প্রত্যেক মানুষের কাজের হিসাব সংরক্ষিত থাকবে।সূরা আল-ইনশিকাক-এ বলা হয়েছে:“যার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, তার হিসাব সহজ হবে। আর যার বাম হাতে দেওয়া হবে, সে ধ্বংস কামনা করবে।”ডান হাতে আমলনামা পাওয়া সৌভাগ্যের নিদর্শন। বাম হাতে পাওয়া চরম দুর্ভাগ্য।

হিসাব-নিকাশ

আল্লাহ অত্যন্ত ন্যায়বিচারক। কারও প্রতি সামান্যও জুলুম হবে না।সূরা আল-যালযালাহ-এ বলা হয়েছে:“যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখবে। আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সেও তা দেখবে।”প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ, এমনকি অন্তরের নিয়তও বিচার করা হবে।

পুলসিরাত

হিসাবের পর মানুষকে পুলসিরাত পার হতে হবে।এটি জাহান্নামের উপর স্থাপিত একটি সেতু।
চুলের চেয়েও সরু।তরবারির চেয়েও ধারালো।কেউ বিদ্যুতের গতিতে পার হবে, কেউ দৌড়ে, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে, আর কেউ পড়ে যাবে জাহান্নামে।

জান্নাত ও জাহান্নাম

জান্নাত-জান্নাত হলো চিরস্থায়ী সুখের স্থান।সূরা আল-ওয়াকিয়া-এ জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনা রয়েছে:চিরযৌবন,শান্তি,দুঃখহীন জীবন,প্রবাহিত নদী,সুস্বাদু ফলমূল,সবচেয়ে বড় নেয়ামত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।জাহান্নাম-জাহান্নাম হলো কঠিন শাস্তির স্থান।সূরা আল-মুলক-এ বলা হয়েছে:“যখন তারা তাতে নিক্ষিপ্ত হবে, তখন তারা তার প্রচণ্ড গর্জন শুনবে।”জাহান্নামের আগুন দুনিয়ার আগুনের চেয়ে বহু গুণ বেশি উত্তপ্ত।

বিচার দিবসে কারা সফল?

১. যারা ঈমান এনেছে ২. যারা সৎকর্ম করেছে ৩. যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে ৪. যারা তওবা করেছে …রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যে নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য কাজ করে।”

কিয়ামতের বিশ্বাসের গুরুত্ব

আখিরাতে বিশ্বাস না থাকলে মানুষ অন্যায় করতে ভয় পায় না। কিন্তু যখন জানে যে প্রতিটি কাজের হিসাব হবে, তখন সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে।  কিয়ামতের বিশ্বাস: মানুষকে সৎ করে,,অন্যায় থেকে দূরে রাখে…ধৈর্যশীল করে..আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করে

 

আমাদের করণীয়

১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা ২. হারাম থেকে বেঁচে থাকা ৩. মানুষের হক আদায় করা
৪. তওবা ও ইস্তিগফার করা ৫. কুরআন পড়া ও বোঝা

উপসংহার

কিয়ামত ও বিচার দিবস কোনো কল্পকাহিনী নয়—এটি অবশ্যম্ভাবী সত্য। আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন পরীক্ষা করার জন্য। এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী।আজ আমরা সুস্থ, শক্তিশালী এবং স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছি। কিন্তু সেই দিন আমাদের হাত-পা, চোখ-কান—সব আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।ভাই, আসুন আমরা নিজেদের প্রস্তুত করি।আমরা যেন সেই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হই, যারা ডান হাতে আমলনামা পাবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করবে।আল্লাহ আমাদের সবাইকে কিয়ামতের ভয়াবহতা থেকে হেফাজত করুন এবং জান্নাত নসিব করুন। আমিন।

IslamicSeva

About Author

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You may also like

সূরা আল-বাকারাহ
কুরআন ও তাফসীর

আল্লাহর দিশা কেবল তাঁরই হাতে — সূরা আল-বাকারাহ (২:২) এর তাফসীর।

কোরআনের আলোয় জীবনকে গড়তে চাইলে জানতে হবে— হেদায়েত কাকে বলে, কে এই হেদায়েত পায়, আর কারা বঞ্চিত হয়। পড়ুন সূরা
মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার
হাদিস

“মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার, আর কাফেরের জন্য জান্নাত – সহীহ হাদিস ও শিক্ষা”

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “মুমিনের জন্য দুনিয়া কারাগার আর কাফেরের জন্য জান্নাত।” (সহীহ মুসলিম)। এই হাদিসের ব্যাখ্যা, শিক্ষা ও আমাদের জন্য