ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে যে কয়েকজন মহান ব্যক্তিত্ব তাঁদের জীবনের মাধ্যমে ইসলামকে উজ্জ্বল করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন হযরত উসমান বিন আফফান (রাযি.)। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘনিষ্ঠ সাহাবী, ইসলামের তৃতীয় খলিফা, এবং দ্বিগুণ জামাতা (ذو النورين) হিসেবে ইতিহাসে অমর। তাঁর জীবন ছিল বিনয়, দানশীলতা ও লজ্জাশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
জন্ম ও বংশপরিচয়
হযরত উসমান (রা.) জন্মগ্রহণ করেন তাইফ নগরীতে (কিছু বর্ণনায় মক্কায়), হিজরতের প্রায় ৪৭ বছর আগে, অর্থাৎ ৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে।তাঁর বংশ ছিল কুরাইশ গোত্রের অন্যতম সম্মানিত শাখা বানু উমাইয়া।পিতার নাম: আফফান ইবন আবিল আস ,মাতার নাম: আরওয়া বিনতে কুরাইয
দাদা: উমাইয়া ইবন আবি আস ..তিনি জন্ম থেকেই সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন, এবং ছোটবেলা থেকেই সত্যবাদিতা, শালীনতা ও সৌন্দর্যে সকলের প্রিয় ছিলেন।
ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ
হযরত উসমান (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম দিককার গ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম।
যখন হযরত আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন, তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু উসমান (রা.)-কে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করেন। উসমান (রা.) তখনই বলেন: “এমন ধর্ম যা সত্য ও ন্যায়ের কথা বলে, আমি কেন তা গ্রহণ করবো না?” তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স ছিল প্রায় ৩৪ বছর।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জামাতা হওয়া
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর কন্যা হযরত রুকাইয়া (রা.)-এর সাথে উসমান (রা.)-এর বিবাহ দেন।
রুকাইয়া (রা.)-এর মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর আরেক কন্যা উম্মে কুলসুম (রা.)-এর সাথে উসমান (রা.)-এর বিয়ে দেন।এই কারণে তাঁকে বলা হয় “ذو النورين (যুল নূরাইন)” — অর্থাৎ দুই নূরের অধিকারী।
হিজরত ও ত্যাগ
যখন মক্কার মুশরিকরা মুসলমানদের উপর নির্যাতন শুরু করে, তখন উসমান (রা.) ও রুকাইয়া (রা.) প্রথম দলগুলোর একজন হিসেবে হাবশায় হিজরত করেন। এরপর মদীনায় দ্বিতীয় হিজরতেও তিনি অংশ নেন।তিনি নিজের সম্পদ দিয়ে বহু মুসলমানকে সহায়তা করেন, যেন তারা নিরাপদে হিজরত করতে পারে।
দানশীলতা ও মানবসেবা
হযরত উসমান (রা.)-এর দানশীলতার উদাহরণ ইসলামের ইতিহাসে বিরল।রমা কূপ ক্রয়:মদীনায় পানির সংকটে মুসলমানদের জন্য এক ইহুদির মালিকানাধীন কূপ ছিল, যার পানি বিক্রি হতো টাকায়।উসমান (রা.) সেই কূপটি ২০,০০০ দিরহাম দিয়ে ক্রয় করে উম্মতের জন্য ওয়াকফ করে দেন।আজও সেই কূপ “বির রুমা” নামে পরিচিত। তাবুক যুদ্ধে অনুদান: রাসূলুল্লাহ ﷺ তাবুক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন উসমান (রা.) নিজে থেকে ৩০০ উট, ৫০ ঘোড়া এবং ১০,০০০ দিরহাম দান করেন। এতে নবী ﷺ বলেন: “আজ থেকে উসমান যা করবে, তার কোনো ক্ষতি হবে না।” (তিরমিজি) মসজিদে নববী সম্প্রসারণ: তিনি নিজের অর্থে জমি কিনে মসজিদে নববীর আকার বড় করেন, যেন মুসল্লিরা আরামে নামাজ আদায় করতে পারে।
কুরআন সংকলনের মহান উদ্যোগ
হযরত উসমান (রা.)-এর অন্যতম বড় অবদান হলো কুরআন শরীফকে একত্রে সংকলন ও মানকরণ করা।হযরত আবু বকর (রা.)-এর সময় প্রথম সংকলন হয়, কিন্তু পরে বিভিন্ন এলাকায় পাঠভেদ দেখা দিলে উসমান (রা.) সিদ্ধান্ত নেন একক মান অনুসারে কুরআনের কপি প্রস্তুত করবেন।তিনি হযরত জায়েদ ইবন সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন, যারা কুরআনকে এক মানক রূপে লিখে বিভিন্ন ইসলামী প্রদেশে পাঠিয়ে দেন।এভাবে মুসলমানরা একই কিরআতে কুরআন পাঠ করা শুরু করেন।এটি ইসলামী ঐক্যের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।
তাঁর খিলাফতকাল
হযরত উসমান (রা.) ২৪ হিজরি থেকে ৩৫ হিজরি পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ১২ বছর, ইসলামী খেলাফতের দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম ছয় বছর ছিল সমৃদ্ধি ও শান্তিতে ভরপুর—ইসলাম দ্রুত প্রসার লাভ করে মিসর, ইরান, আফ্রিকার অংশ মুসলিম শাসনে আসে জাহাজভিত্তিক নৌবাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন সরকারি প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনেন শেষ ছয় বছর ছিল পরীক্ষা ও ফেতনায় পূর্ণ।
কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তোলে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে শহীদ করে।
চরিত্র ও গুণাবলি
হযরত উসমান (রা.) ছিলেন এক অত্যন্ত লজ্জাশীল, নম্র ও উদার হৃদয়ের মানুষ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “ফেরেশতারা পর্যন্ত উসমানকে লজ্জা করে।” (সহিহ মুসলিম)
তাঁর কিছু বিশেষ গুণ: লজ্জাশীলতা: এমন যে, নবী ﷺ তাঁর সামনে বসার সময় পর্যন্ত কাপড় ঠিক করতেন। সত্যবাদিতা: কখনো মিথ্যা বলেননি। দানশীলতা: দরিদ্রদের সাহায্যে সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন। নরম মেজাজ: শত্রুর সাথেও শান্তভাবে আচরণ করতেন। ইবাদতপ্রিয়তা: রাতে দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তেন ও কুরআন তিলাওয়াত করতেন।
শাহাদাতের ঘটনা
৩৫ হিজরিতে কিছু বিদ্রোহী মদীনায় প্রবেশ করে হযরত উসমান (রা.)-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে।
তিনি বলেন: “আমি রক্তপাত চাই না। আমি মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধের সূচনা হতে দিতে পারি না।” বিদ্রোহীরা যখন ঘরে প্রবেশ করে তাঁকে কুরআন তিলাওয়াতরত অবস্থায় হত্যা করে।
তাঁর রক্তের ফোঁটা পড়েছিল কুরআনের আয়াতের উপর: “আল্লাহ তোমার জন্যই যথেষ্ট, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল-বাকারা: ১৩৭) এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে গভীর শোক ও ফিতনার সূচনা ঘটায়।
মৃত্যুর পর ও উত্তরাধিকার
হযরত উসমান (রা.)-কে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।তাঁর মৃত্যুর পর মুসলমানদের মাঝে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়, যা পরে হযরত আলী (রা.)-এর সময় পর্যন্ত চলতে থাকে।
শিক্ষণীয় দিক
হযরত উসমান (রা.)-এর জীবন থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি: লজ্জা ও বিনয় ইসলামী চরিত্রের অলঙ্কার। আল্লাহর পথে দান কখনো বৃথা যায় না। ধৈর্য ও সহনশীলতা একজন নেতার শ্রেষ্ঠ গুণ। কুরআন সংরক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামের ঐক্য রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব।

